সাইবার দুনিয়ায় নিরাপদ থাকার উপায়
সাইবারজগতে নানাভাবে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, সম্মানহানির শিকার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা বিদ্যমান। হয়তো অসতর্কতাবশত কোনো লিংকে ক্লিক করে হারাতে পারেন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিও। ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ চলে যেতে পারে হ্যাকারের হাতে। এসব থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান পলাশের কাছে জানতে চেয়েছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
জসামাজিক যোগাযোগ গ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তো আছেই; এমনকি অতিকষ্টে তৈরি করা ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউব চ্যানেলও চলে যায় হ্যাকারদের দখলে। এ ধরনের অবস্থা হলে আপনি কী করবেন? কিংবা কোন ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করলে বিপদে পড়ার আশঙ্কা কম? এসব নিয়ে কথা বলেছেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান পলাশ। আট বছর ধরে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এজেন্সি টেকমেন্ড বিডির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং কাজগুলো পরিচালনা করার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে কাজ করে থাকেন সাইফুল ইসলাম।
সাইবার সিকিউরিটি কী?
সহজ ভাষায় বললে ইন্টারনেট কানেক্টেড বা ডিজিটাল ব্যবহৃত যেকোনো সিস্টেম, যেমন—হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, ডাটা ইত্যাদিকে সাইবারঝুঁকি থেকে নিরাপত্তা দেওয়া। কখন কিভাবে হ্যাকার তথ্য চুরি করে নেবে, সেটা আঁচ করা যায় না একদম। তবে সতর্ক থাকলে অনেকাংশেই বিপদ এড়ানো সম্ভব।
নিরাপদ থাকুক ফেসবুক
অনেকেই ফেসবুকের সিকিউরিটি ফিচারগুলো ব্যবহার করে না এবং স্পাম বা ফিশিং লিংকে গিয়ে তথ্য দেয়। ফলে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয় এবং হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন ফ্রডের শিকার হয়। ফেসবুক নিরাপদ রাখার কিছু উপায় হচ্ছে :
♦ টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অন রাখা।
♦ অ্যাকাউন্টের ই-মেইল, মোবাইল নম্বর ও জন্মতারিখের (মাস, তারিখ, সাল) প্রাইভেসি অনলি মি রাখা।
♦ অপরিচিত মানুষের অ্যাকাউন্টে অ্যাড না রাখা, প্রয়োজনে অ্যাকাউন্ট লক রাখা। প্রয়োজনে পোস্ট প্রাইভেসি ফ্রেন্ডস রাখা।
♦ ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান থেকে দূরে থাকা।
♦ নিরাপদ নয় এমন কোনো লিংকে ক্লিক না করা। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা।
যেমন—নতুন এনআইডি পেয়ে বা পাসপোর্ট পেয়ে সেগুলোর ছবি পোস্ট করা, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের ছবি শেয়ার করা ইত্যাদি।
♦ ইনবক্সে বা কোথাও কোনো লিংকে যাচাই-বাছাই না করে ক্লিক করলে এবং সেটা ফিশিং লিংক হলে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
♦ মানুষ যখন কোথাও বেড়াতে যায়, বাসায় কিংবা বাইরে নানা রকম প্রগ্রামে অংশ নেয় তখন ছবি পোস্ট করে। এর মাধ্যমে অপরাধীরা আপনার চালচলন, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আপনার ক্ষতি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট লক রাখা অথবা অচেনা কাউকে আপনার ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড না করা ভালো। প্রয়োজনে পোস্ট প্রাইভেসি ফ্রেন্ডস করে রাখা ভালো।
কে আসল কে নকল
ফেক আইডি চেনার উপায় কী? পলাশ বলেন, ফেক আইডি চেনার উপায় হলো আইডিতে ছবি না থাকা, বেসিক আইডেনটিটি না থাকা, ফেক বা ভুয়া নাম ব্যবহার করা।
ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ
আপনি চাইছেন আপনার সমস্যার কথা সরাসরি ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। ভাবছেন, এও কি সম্ভব? বাংলাদেশে ফেসবুকের কোনো অফিস নেই। তবে ফেসবুক লাইভ সাপোর্টের মাধ্যমে যে কেউ ফেসবুকের এজেন্টের সঙ্গে তার সমস্যা নিয়ে যোগাযোগ করতে পারে।
সাইবার ক্রাইমের শিকার হলে যা করবেন
অন্তরঙ্গ ছবি, গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি, ছবি সম্পাদনা করে খারাপ ছবি জুড়ে দেওয়া—যেকোনোভাবেই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে প্রথম করণীয় হচ্ছে বিশ্বাস করা যায় এমন কাউকে জানানো। সেটা ভাই-বোন, শিক্ষক, মা-বাবা অথবা বন্ধু হতে পারে। ভিকটিমকে প্রেসার না দিয়ে এ সময় অভিভাবকদের সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিকটস্থ থানায় অথবা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কোনোভাবেই অপরাধীর কথামতো না চলা এবং বিষয়টি মুখ বুজে সহ্য না করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উত্তম। সাইবার নিরাপত্তা আইনের ১৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত (অন্তরঙ্গ) ছবি তোলে ও প্রকাশ করে, তাহলে সে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
সাইবার বুলিং
ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাউকে উদ্দেশ করে কটূক্তি করা বা কাউকে মানহানিকর মন্তব্য করে হেয় প্রতিপন্ন করাকেই সাইবার বুুলিং বলা হয়। তেমনিভাবে কারো ছবি বা ভিডিও চিত্র বিকৃত ও মানহানিকরভাবে উপস্থাপন করাকেও সাইবার বুলিং বলা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫(১) ধারায় প্রথমবার সাইবার বুলিংয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তিন বছরের জেল বা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে সহিংসতা, হুমকি, হয়রানি, অনলাইন ফ্রড, ব্ল্যাকমেইল ইত্যাদি সাইবার ক্রাইমের শিকার হলে আইনগত সহযোগিতা পেতে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, সাইবার পুলিশ সেন্টার, হ্যালো সিটি এফ, রিপোর্ট টু র্যাব অ্যাপ, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন এবং ৯৯৯-এ অভিযোগ করা যেতে পারে।
Sextortion-এর শিকার হলে
Sextortion একটি সিরিয়াস ক্রাইম। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের জন্য ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে টাকা-পয়সা চাওয়া হয়। এ থেকে বাঁচতে হলে পরামর্শ—নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন, আপনার বিশ্বস্ত কারো সঙ্গে কথা বলুন, রিপোর্ট করুন, ছবি বা ভিডিও শেয়ার বা ফরোয়ার্ড করা থেকে বিরত থাকুন, বন্ধুদের সাহায্য নিন।
হোয়াটসঅ্যাপ থাকুক নিরাপদে
আপনার হোয়াটসঅ্যাপের রেজিস্ট্রেশন কোড বা টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশনের পিন কারো সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন অন রাখুন এবং ই-মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে রাখুন, যাতে কখনো পিন ভুলে গেলে ফরগেট করতে পারেন। ডিভাইস কোড সেট করুন। আপনার ডিভাইস কাকে দিচ্ছেন বা কেউ ব্যবহার করছে কি না তা নিয়ে সতর্ক থাকুন, ফিজিক্যালি আপনার ডিভাইস নিয়ে যে কেউ আপনার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে আপনি চাইলে হোয়াটসঅ্যাপে ডিভাইস লক ইউজ করতে পারেন।
ওয়েবসাইট নিয়ে কিছু কথা
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার নতুন ওয়েবসাইট হ্যাক হয়। তাই ওয়েবসাইট নিরাপদ রাখতে হলে যে জিনিসগুলো আপনার জানা প্রয়োজন :
♦ SSL সার্টিফিকেট ইনস্টল এবং HTTPS ব্যবহার করুন।
♦ ওয়েবসাইট এবং ওয়েবসাইটে ব্যাবহৃত ফ্রেমওয়ার্ক ও প্লাগ ইন নিয়মিত আপডেট রাখুন।
♦ শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
♦ নিয়মিত ওয়েবসাইটের ব্যাকআপ রাখুন।
♦ সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট নিয়মিত স্ক্যান করুন।
♦ ওয়েবসাইটের ডিফল্ট অ্যাকাউন্ট, ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।
♦ ফিশিং লিংক সম্পর্কে জানুন এবং সাবধানতা অবলম্বন করুন।
জনসচেতনতার বিকল্প নেই
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মা-বাবা, শিক্ষক, গণমাধ্যম—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
পলাশের মতে, সচেতনতাই পারে অনেকাংশে সাইবার ক্রাইম কমিয়ে দিতে। সমস্যায় পড়লে মুখ বুজে সহ্য নয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য নিতে পারেন।